ডিসিসিআইয়ের আলোচনায় প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা

বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রভাব খাটাতে চায় না সরকার

বর্তমান সরকার কোনোভাবেই বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রভাবিত করতে চায় না বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) মিলনায়তনে গতকাল এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ তথ্য কথা বলেন। ডিসিসিআই আয়োজিত ‘ব্যাংক খাতের সমন্বয়: ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতার দৃষ্টিভঙ্গি’ শীর্ষক এ সভায় সভাপতিত্ব ও মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চেম্বার সভাপতি তাসকিন আহমেদ।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘দেশে কর্মসংস্থানের প্রধান চালিকাশক্তি হলো সিএমএসএমই খাত। কিন্তু বাস্তব চিত্র হলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে ঋণ প্রদানের লক্ষ্যমাত্রা কাগজে থাকলেও তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। এমনকি নারী উদ্যোক্তাদের জন্য নির্ধারিত অর্থও অনেক ক্ষেত্রে অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে, যা নীতিগত দুর্বলতা এবং বাস্তবায়ন ঘাটতির স্পষ্ট ইঙ্গিত।’

তিনি বলেন, ‘স্থানীয় ব্র্যান্ডগুলোকে বৈশ্বিক পর্যায়ে তুলে ধরার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। কারণ এগুলো শ্রমঘন শিল্প এবং বৃহৎ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে। বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানা পুনরায় চালু এবং সচল শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো গতিশীল করা এখন সময়ের দাবি।’

প্রধানমন্ত্রীর এ উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা উত্তরাধিকারসূত্রে একটি চ্যালেঞ্জিং অর্থনীতি পেয়েছি, যার সঙ্গে বৈরী ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি যুক্ত হয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা কোনোভাবেই কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ডিক্টেট (প্রভাবিত) করতে চাই না; বরং রাজস্ব ও মুদ্রানীতির মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করতে চাই। বাংলাদেশ ব্যাংক নিজে পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে। আর তথাকথিত কেতাবি কায়দায়ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিচালিত হবে না।’

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানান, আগামী বাজেটে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য বিশেষ প্রণোদনা, কর কাঠামো সংস্কার এবং যৌথ তহবিল গঠনের মতো উদ্যোগ নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের সময় ডিসিসিআই সভাপতি তাসকিন আহমেদ বলেন, ‘দীর্ঘদিনের ব্যবসা-সহায়ক পরিবেশের ঘাটতির কারণে শিল্প খাতে উৎপাদন কমেছে, বেড়েছে খেলাপি ঋণ এবং কমেছে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ। বর্তমানে ব্যাংক খাতে তারল্যের ঘাটতি না থাকলেও অতিরিক্ত তারল্য প্রায় ৩ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকা—ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।’

তিনি জানান, শিল্প খাতের মোট ঋণের প্রায় ৫০ শতাংশ অনাদায়ী এবং খেলাপি ঋণের হার ৩১ শতাংশের বেশি। একইভাবে এসএমই খাতের প্রায় ৩৫ শতাংশ ঋণ সময়মতো পরিশোধ হচ্ছে না। ফলে ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে অনাগ্রহী হয়ে উঠছে এবং ট্রেজারি বিলের মতো ঝুঁকিহীন বিনিয়োগে ঝুঁকছে।

এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ব্যাংক খাতের কাঠামোগত সংস্কার, সুশাসন নিশ্চিতকরণ এবং ব্যাংক ও বেসরকারি খাতের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন ডিসিসিআই সভাপতি।

সভায় বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকার এসএমই অর্থায়ন সহজ করার ওপর জোর দিয়ে বলেন, ‘নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে, যা দূর করা জরুরি।’

অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই ও স্পেশাল প্রোগ্রামস বিভাগের পরিচালক নওশাদ মোস্তফা বলেন, ‘নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাব সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করছে। এজন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর তথ্য বিনিময় ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন।’

অনুষ্ঠানে বক্তারা আরো বলেন, ব্যাংক খাতে আস্থার ঘাটতি, উচ্চ সুদের হার, কঠোর ঋণ শর্ত এবং তথ্যের অসমতা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। ফলে একদিকে ব্যবসায়ীরা প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পাচ্ছেন না, অন্যদিকে ব্যাংকগুলোও ঝুঁকি এড়াতে ঋণ বিতরণে অনাগ্রহী হয়ে উঠছে, যা সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিতে একটি ক্রেডিট সংকট পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে।

অনুষ্ঠানে এনসিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী শামসুল আরেফিন, সিটি ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আশানুর রহমানসহ খাতসংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।

আরও